আমাদের
দেশে ইদানিং খাবার হিসেবে
কোয়েল পাখির ডিমের বেশ
জনপ্রিয়তা লক্ষ করা যাচ্ছে। গড়ে
উঠছে অনেক কোয়েল পাখির
খামার। তাই
এ ডিমের পুষ্টিগুণ ও
স্বাস্থ্য উপকারের কথা জানতে চান
অনেকে।
প্রথমেই
মাথায় রাখা দরকার কোয়েলের
ডিম খুবই ছোট।
একটি কোয়েল পাখির ডিম
বড়জোর ৯ গ্রাম ওজনের
হয়ে থাকে। যেখানে
একটি মুরগির ডিম ৫০
গ্রাম পর্যন্ত হয়। তাই
পরিমাণের দিক দিয়ে ৫টি
কোয়েলের ডিম একটি মুরগির
ডিমের সমপর্যায়ের হয়ে থাকে।
আসুন জেনে নিই কোয়েলের
ডিম কতটা পুষ্টিকর এবং
স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।
কতটা পুষ্টিকর?
প্রোটিনের
শক্তিশালী উৎস। উপকারী
কোলেস্টেরল, ভিটামিন ‘বি১’, ভিটামিন ‘বি২’
ও ভিটামিন ‘এ’ আছে।
মুরগির ডিমের চেয়ে কোয়েলের
ডিমে ভিটামিন ‘বি১’ ছয় গুণ
এবং ভিটামিন ‘বি২’ ১৫ গুণ
বেশি থাকে। এই
প্রোটিন অত্যন্ত পুষ্টিকর এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা
বৃদ্ধি করে।
১. দেহের শক্তি বাড়ায়
কোয়েলের
ডিম আমাদের শরীরের জন্য
বেশ ভালো একটি শক্তির
উৎস হতে পারে।
কোয়েলের ডিম প্রোটিন ও
আয়রনে সমৃদ্ধ, যা শরীরের এনার্জি
লেভেল বাড়িয়ে দিতে বিশেষ
ভূমিকা রাখে। সব
ধরণের প্রোটিনই বহু অ্যামিনো অ্যাসিড
অণুর দ্বারা তৈরি চেইন
দিয়ে গঠিত হয়।
কোয়েলের ডিমের অ্যামিনো অ্যাসিড
প্রোফাইল তৈরি করে দেখা
যায়, এতে বেশ গুরুত্বপূর্ণ
কিছু অ্যামিনো অ্যাসিড বিদ্যমান। শরীরের
ব্লাড শুগার নিয়ন্ত্রণে এদের
মধ্যে কয়েকটি অ্যামিনো অ্যাসিড
বেশ কার্যকর ভূমিকা পালন করে। অন্য
কয়েকটি অ্যামিনো অ্যাসিড রয়েছে যারা টিস্যুর
ক্ষয়রোধ ও নতুন টিস্যু
গঠন করে। এছাড়াও
কোয়েল পাখির ডিমে পাওয়া
যায় লাইসিন নামক অ্যামিনো
অ্যাসিড, যা শরীরে অ্যান্টিবডি
তৈরিতে এবং হরমোন, কোলাজেন
ও এনজাইম উৎপাদনে ভূমিকা
রাখে। নতুন
রক্ত তৈরিতে আয়রনের ভূমিকা
বেশ তাৎপর্যবহ। শরীরে
আয়রনের অভাব হলে অ্যানেমিয়া
বা রক্ত স্বল্পতা দেখা
দেয়, যার ফলে ঘন
ঘন ক্লান্তি ও শ্বাস-প্রশ্বাসে
অসুবিধা দেখা যায়।
২. মস্তিষ্ক এবং স্নায়ুতন্ত্রের সুস্থতা
নিশ্চিত করে
আমাদের
মস্তিষ্কের কার্যকলাপ ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের
জন্য ভিটামিন বি১২, থাইমিন (ভিটামিন
বি১) ও ভিটামিন বি২
বেশ গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনীয়
পরিমাণে ভিটামিন বি১২ আমাদের স্মৃতিশক্তির
ক্ষয় রোধ করতে সহায়ক। কোয়েলের
ডিম ভিটামিন বি১২ এবং রিবোফ্লাভিন
(ভিটামিন বি১২) এর একটি
ভালো উৎস। কিছু
পরিমাণ থাইমিনও (ভিটামিন বি১) এতে বিদ্যমান।
৩. যকৃত, ত্বক, চুল
ও চোখের সুরক্ষা দেয়
রিবোফ্লাভিন,
যা মূলত ভিটামিন বি
২ নামে পরিচিত, দেহের
বিভিন্ন শারীরবৃত্তিক প্রক্রিয়ার জন্য খুবই দরকারী। সাধারণত
ভিটামিন বি ২ সহ
অন্যান্য বি শ্রেণীর ভিটামিন
আমাদের লিভার, ত্বক, চুল
ও চোখের সুস্থতা নিশ্চিত
করে। শরীরে
লোহিত রক্ত কণিলা উৎপাদনেও
রিবোফ্লাভিন খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
পালন করে। কোয়েলের
ডিমে আকারের অনুপাতে রয়েছে
প্রচুর পরিমাণে রিবোফ্লাভিন, একের অধিক কোয়েলের
ডিম নিয়মিত খেলে তা
আমাদের লিভার, ত্বক, চুল,
চোখের সুস্থতার জন্য যথেষ্ট!
৪. ক্যান্সার প্রতিরোধ করে
কোয়েলের
ডিমে প্রাপ্ত খণিজ উপাদানগুলোর একটি
হলো সেলেনিয়াম। এই
খণিজ দ্রব্যটি প্রোস্টেট ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য
করে। সেলেনিয়ামে
রয়েছে অ্যান্টি অক্সিডেন্ট যা আমাদের দেহকোষকে
ক্ষয় হয়ে যাওয়া ও
জারণ থেকে রক্ষা করে। এইচ
আই ভি ও ক্রন’স ডিজিজ আক্রান্ত
মানুষের দেহে সেলেনিয়ামের অভাব
লক্ষ্য করা যায়।
স্বাভাবিক মানুষের শরীরে সেলেনিয়ামের তেমন
ঘাটতি পরিলক্ষিত না হলেও প্রতিদিনের
খাদ্যাভ্যাসে সেলেনিয়ামযুক্ত খাদ্য রাখাটা স্বাস্থ্যের
পক্ষে ভালো। সেক্ষেত্রে
কোয়েলের ডিম অনেক সহায়তা
করতে পারে।
৫. দৃষ্টিশক্তি বাড়ায়
উচ্চমাত্রার
ভিটামিন ‘এ’-এর উৎস
কোয়েলের ডিম। কাজেই
দৃষ্টিশক্তি প্রখর হয়।
এর অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট চোখের পেশির দেখভাল
করে। চোখে
সহসা ছানি পড়তে দেয়
না। চোখের
বেশ কিছু সাধারণ সমস্যা
দূর হয়।
৬. কোলেস্টেরলের ভারসাম্য রক্ষা করে
উল্লেখযোগ্য
পরিমাণ ফ্যাটি অ্যাসিড আছে
এই পাখির ডিমে।
এলডিএল বা বাজে কোলেস্টেরলের
কার্যকারিতা রুখতে দরকার হয়
এইচডিএল বা উপকারী কোলেস্টেরল। কোয়েলের
ডিমের ফ্যাটের ৬০ শতাংশই এইচডিএল
রক্ষায় ব্যয় হয়।
ফলে দেহে ভালো কোলেস্টেরল
ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় থাকে।
৭. উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ
করে
এই ডিমে পটাসিয়ামের উপস্থিতি
রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।
এই খনিজ রক্তবাহী নালি
এবং শিরাগুলোতে আরাম দেয়।
ফলে এগুলো সুষ্ঠুভাবে কাজ
করে। তুলনামূলকভাবে
মুরগির ডিমের চেয়ে অনেক
বেশি পটাসিয়াম রয়েছে কোয়েলের ডিমে।
৮. দেহ পরিষ্কার করে
দেহকে
বিষমুক্তকরণ অতি জরুরি বিষয়। পরিবেশের
অনেক ক্ষতিকর উপাদান দেহে প্রবেশ
করে দূষণ ঘটায়।
রক্তপ্রবাহ থেকে এসব উপাদান
বের করে দিতে দারুণ
ভূমিকা রাখতে পারে কোয়েলের
ডিম। মূত্রথলি
এবং কিডনিতে পাথর হতেও বাধা
দেয়।
৯. অ্যালার্জি নিরাময় করে
ডিমের
সাদা অংশে থাকে ওভোমিউকয়েড
প্রোটিন। এটা
প্রাকৃতিক অ্যান্টি-অ্যালার্জির মতো কাজ করে। রক্ত
জমাট বাঁধা, ইনফ্লামেশনসহ অ্যালার্জি
বিভিন্ন লক্ষণ থাকলে কোয়েলের
ডিম খুবই উপকারী।
এ ছাড়া সুষ্ঠু বিপাকক্রিয়া
ও শক্তি বৃদ্ধির জন্য
এই ডিমে ভরসা রাখুন।
সাবধানতা
এই ডিমে সামান্য পরিমাণে
সম্পৃক্ত ফ্যাট আছে।
কাজেই অতিমাত্রায় খাওয়া ঠিক না। তা
ছাড়া এমনিতেই অতিরিক্ত কোনো কিছুই ভালো
নয়।
যেকোনো
ডিমই নিঃসন্দেহে আমাদের দৈনন্দিন খাদ্য
তালিকায় রাখার মতো একটি
খাবার। কোয়েলের
ডিমও তাই। একটি
স্বাস্থ্যকর ডায়েটের অবিচ্ছেদ্য উপাদান হতে পারে
ডিম। তবে
মাথায় রাখতে হবে ডিমে
আছে বেশ ভালো পরিমাণে
ফ্যাট ও কোলেস্টেরল, যা
অন্যান্য ফ্যাক্টরের সাহায্য নিয়ে বিভিন্ন হৃদরোগের
সৃষ্টি করতে পারে।
তাই আপনার যদি ডায়বেটিস
থেকে থাকে কিংবা কোলেস্টেরল
লেভেল নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খেয়ে থাকেন,
ডিম খাওয়ার ব্যাপারে সচেতন
হওয়া তখন একান্ত কর্তব্য।

Comments
Post a Comment